‘স্বচ্ছ’ ভারত, ‘অস্বচ্ছ’ লেনদেন!

আর্থিক উদারিকরণের হাত ধরেই এ দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ এবং পরে বেসরকারিকরণের সূত্রপাত। বিষয়টি আরও বেশি গতি পায় প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায়। ওই সময়েই তো বিলগ্নিকরণের জন্য সেই বহু বিতর্কিত পৃথক মন্ত্রক। সরকারি সংস্থা, যা কি না আদপে দেশের সাধারণ মানুষের সম্পত্তি, তা বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না, তা নিয়ে গোড়া থেকেই তর্ক বিস্তর। এবং আমি নিশ্চিত, অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সেই বিতর্ক আবহমান কাল ধরে চলতেই থাকবে।
এক পক্ষের মতে, বেসরকারি সংস্থা পরিচালনা সরকারের কাজ নয়। তাতে তার স্বাভাবিক দক্ষতা নেই। তাই সেই দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থাকেই দেওয়া ভাল। আবার অন্য পক্ষের যুক্তি, পরিচালনায় গলদ, মুনাফার জন্য বাড়তি ঝুঁকি ইত্যাদি কারণে বেসরকারি সংস্থা ডোবার উদাহরণ সারা বিশ্বেই ভুরিভুরি। ফলে দক্ষতা শুধু তাদেরই, এমন যুক্তি সে ভাবে ধোপে টেকে না। বরং সরকারি সম্পদ পকেটে পুরে মুষ্টিমেয় কিছু শিল্পপতি (সাধারণত সরকার-ঘনিষ্ঠ) বরাবর লাভবান হন বলেই অভিযোগ তাঁদের। 
আমার আজকের নিবন্ধে এই তর্ক গৌরচন্দ্রিকা হলেও, তা আলোচনার বিষয় নয়। বিলগ্নিকরণ কিংবা বেসরকারিকরণ করা ঠিক কি না, তা আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, মোদী সরকার রাজকোষ ভরার জন্য যদি সেই পথে হাঁটেও, তা আদৌ স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হচ্ছে কি? সাম্প্রতিক একাধিক উদাহরণ অন্তত তেমন ইঙ্গিত দেয় না।
এ বিষয়ে দু’টি উদাহরণ নিয়ে আজ আলোচনা করা যাক। প্রথমটি সিইএল বা সেন্ট্রাল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। এই সংস্থা নিজস্ব গবেষণার ভিত্তিতে বিভিন্ন উচ্চমানের বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র তৈরি করে এসেছে দীর্ঘদিন। তা বিক্রি করেছে ভারতীয় স্থলসেনা, বায়ুসেনা, নৌসেনা, রেল মন্ত্রক ইত্যাদির কাছে। সুরক্ষার জন্য উন্নত মানের পণ্য তৈরিতে এরা দড়। ২০১৬ সালে মোদী সরকার এই সংস্থা বেসরকারিকরণের কথা ঘোষণা করে। প্রশ্ন ওঠে, যে সরকার এক দিকে আত্মনির্ভরতার স্লোগান তুলছে, তারাই আবার এমন সংস্থাকে বেচে দেওয়ার কথা বলছে কেন!
তা-ও না হয় বাদ দেওয়া গেল। সংস্থাটিকে বিক্রির কথা বলা হল কার কাছে? ২০২১ সালের নভেম্বরে দিল্লির নন্দলাল ফিনান্স অ্যান্ড লিজ়িং ২১০ কোটি টাকায় ওই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিকে হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিরোধীদের অভিযোগ, আদতে সংস্থার দাম অনেক বেশি। জলের দরে একে বেচে দিতে চাইছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। যুক্তি, দিল্লির কাছে শাহিদাবাদে সংস্থার যে ৫০ একর জমি রয়েছে, শুধু তার দরই ২১০ কোটি টাকার থেকে বেশি!
কংগ্রেস, সিপিএম, সংস্থার কর্মী ইউনিয়ন এ নিয়ে আদালতে গেল। অনুসন্ধান শুরু করলেন জনা কয়েক সাংবাদিকও। দেখা গেল, দু’টি সংস্থা ওই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কেনার নিলামে যোগ দিয়েছিল। উঠে এল তাদের মধ্যে ‘গোপন যোগাযোগের’ তত্ত্ব। প্রশ্ন উঠল, এত কম দর ওঠার পিছনে কারণ কি তবে ‘গোপন সমঝোতা’? 
রহস্য আরও গভীর হল মালিকানা-পরিচিতিতে। দেখা গেল, নিলামে জয়ী সংস্থার পিছনে রয়েছেন দুই ব্যক্তি। প্রদীপ গুপ্ত এবং যতীন্দ্র গুপ্ত। যাঁরা দিল্লির কাছে সারদা বিশ্ববিদ্যালয় চালান। বিজেপির সহ-কোষাধ্যক্ষ নবীন জৈনের (যিনি আবার আগরার মেয়র) তাঁরা ঘনিষ্ঠ বলেও অভিযোগ। এ নিয়ে অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সিইএল হাতবদলের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে বাধ্য হল সরকার!
এ বার দ্বিতীয় উদাহরণে আসি। গত এপ্রিলে আর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পবন হংস বিক্রির অনুমতি দিয়েছিল ক্যাবিনেট। ১৯৮৫ সালে ভারত সরকারের বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস সংস্থা ওএনজিসি-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল পবন হংস। তখন বম্বে হাই থেকে তেল তোলার প্ল্যাটফর্মে পৌঁছতে হেলিকপ্টার প্রয়োজন ছিল ওএনজিসি-র। সেই সূত্রেই ওই উদ্যোগ। পরে অবশ্য সংস্থাটির তৈরি হেলিকপ্টার, চপার ব্যবহার করেছে সেনা থেকে পর্যটন সংস্থা— সকলে। এখন তাদের ৪২টি হেলিকপ্টারের মধ্যে ৩৭টি বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে উত্তরাখণ্ড, পর্যটন ক্ষেত্র-বিএসএফ থেকে বর্ডার রোডস অর্গানাইজ়েশন— তাদের হেলিকপ্টার ব্যবহারকারীর তালিকায় কে নেই?
দেখা গেল এ হেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার ৫১ শতাংশ শেয়ার ২১১ কোটি টাকায় কেনার জন্য নাম শোনা গেল স্টার-৯ মবিলিটি প্রাইভেট লিমিটেড নামে এক বেসরকারি সংস্থার। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেল, স্টার-৯ মবিলিটির পিছনে রয়েছে তিনটি সংস্থা—
এক, মহারাজা অ্যাভিয়েশন। প্রশ্ন উঠল, তার সঙ্গে বাবা রামদেব, হেমা মালিনী প্রমুখের বিজ্ঞাপন কিংবা অন্য সংক্রান্ত যোগ নিয়ে।
দুই, বিগ চার্টার্ড প্রাইভেট লিমিটেড। এবং তিন, আলমাস গ্লোবাল অপরচুনিটি ফান্ড। এই দুই সংস্থার সম্পর্কেও প্রশ্ন বিস্তর। বিগ চার্টার্ডের সঙ্গে মেঘালয় সরকারের এক সময়ে বিবাদ হয়েছে দিল্লি-শিলং উড়ান  পরিষেবা নিয়ে। ইতিহাসে দাগ আলমাসেরও। তাদের সঙ্গে করফাঁকির স্বর্গরাজ্য কেম্যান আইল্যান্ডের যোগ। কলকাতার আদালত এনসিএলটি এক সময়ে জানিয়েছিল, আদালতকে ভুল পথে পরিচালিত করতে চেয়েছে তারা! কোর্টের খাতায় তার রেকর্ড রয়েছে। জিম্বাবোয়ের যে ব্যবসাদার আলমাসের পিছনে, তাঁর সঙ্গে দুর্নীতির কারণে ব্যবসা করতে অস্বীকার করেছে আমেরিকা ও ব্রিটেন। শেষমেশ এই তবে পবন হংসের মতো সংস্থার ক্রেতা!
আমার বক্তব্য, যখন সাংবাদিকেরা এ ধরনের তথ্য জোগাড় করতে পারছেন, এবং তা পাওয়া যাচ্ছে সংস্থার ওয়েবসাইট কিংবা রেকর্ডে, তখন ভারত সরকার, বিশেষত অর্থ মন্ত্রকের অফিসারেরা তা আগে বার করতে পারছেন না কেন? রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রির আগে এটুকু গবেষণা কি প্রত্যাশিত নয়? বেসরকারিকরণ করা আদৌ উচিত কি না, সেই প্রশ্ন ছেড়েই দিলাম। আগে সরকার উত্তর দিক, শেয়ার বিক্রিতেই বা স্বচ্ছতা কোথায়?
 

(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। তার দায় আরও আনন্দ-এর নয়)

Featured Book: As Author
Divided We Stand
India in a Time of Coalitions
 
Featured Book: As Publisher
The Story of Secularism
15th – 21st Century