পাতে খাবার কই সরকার বাহাদুর!

তেল থেকে আটা, চিনি থেকে চাল— আজ দেশে প্রায় সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যে রকেট গতিতে বাড়ছে, তাতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। বিশেষত খাদ্যসামগ্রীর লাগামছাড়া দর বৃদ্ধিতে নাকাল দরিদ্ররা। আমার মতে, সদ্য কোভিড উঠতে শুরু করা এমন এক সঙ্কটের সময়ে এই মূল্যবৃদ্ধি আম জনতার উপর এক প্রকার অত্যাচার।
বাজারে জিনিসের দাম ঠিক হয় চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে। তাই সমস্ত কিছুর দর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু তা বলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেন সাধারণ মানুষের একেবারে নাগালের বাইরে চলে না যায়, সেই বিষয়টি দেখার দায়িত্ব তো সরকারের! কেন্দ্রকেই তো দেখতে হবে যে, বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের জোগান, নিয়ন্ত্রণ, আমদানি-রফতানি ঠিক কোন তারে বেঁধে রাখলে, দর মাত্রাছাড়া হবে না। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিষয়ে মোদী সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
কেন্দ্রের সাম্প্রতিক খাদ্যপণ্যের জোগান নির্ধারণ, আমদানি-রফতানি নীতি ঠিক করা ইত্যাদি এমন অসংখ্য ভুলে ভরা যে, তার দরুন চড়া মূল্যস্ফীতির হারের বোঝা বইতে হচ্ছে আমজনতাকে। এই ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, এপ্রিলে পাইকারি মূল্য সূচক (হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স) ছিল ১৫ শতাংশের উপরে। খুচরো বাজেরের মূল্য সূচকও রয়েছে (রিটেল প্রাইস ইনডেক্স) ৮ শতাংশের আশেপাশে। মোদী জমানার গত আট বছরেও কখনও যা হয়নি। এই সরকারি তথ্য কতটা ঠিক, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানেই যদি দামের ছেঁকার এমন ছবি ফুটে ওঠে, তবে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। আর হ্যাঁ, মনে রাখা দরকার আগামী দিনে যদি মূল্যবৃদ্ধির এই হার খানিকটা নেমেও আসে, তাহলে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জিনিসপত্রের দর কমল। বড়জোর কিছুটা শ্লথ হল মূল্যবৃদ্ধির গতি— এই পর্যন্ত। এই যেমন, হালে জ্বালানি তেলে উৎপাদন শুল্ক (আসলে তার অন্তর্ভুক্ত সেস) ছাঁটাইয়ের ফলে পেট্রল-ডিজ়েলের দর সামান্য কমেছে। কিন্তু তার মানে নিশ্চয় এই নয় যে, আদপে তা সস্তা হয়ে গেল।
মূল্যবৃদ্ধির জেরে ক্ষোভের আঁচ টের পেয়ে এখন তার হারে লাগাম পরাতে মরিয়া মোদী সরকার, রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কও। সম্প্রতি শীর্ষ ব্যাঙ্ক সুদের হার (রেপো ও রিভার্স রেপো রেট) বাড়িয়েছে। নভেম্বরে এক বার জ্বালানি তেলে উৎপাদন শুল্ক কমানোর পরে ফের তা ছেঁটেছে কয়েক দিন আগে। গম, চিনি ইত্যাদির রফতানি নীতি বদলেছে। আমদানি-রফতানি শুল্ক পাল্টেছে সিমেন্ট, ইস্পাত, প্লাস্টিক ইত্যাদিতেও।
এই সমস্ত করে লাভ কতখানি হবে, বা আদৌ হবে কি না, তা সময় বলবে। কিন্তু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এই সঙ্কট ডেকে আনার অন্যতম কারণ সরকারি নীতির অস্থিরতা। আগুপিছু না ভেবেই চমক দিতে দুম করে একটা কিছু ঘোষণা করে দেওয়ার প্রবণতা। যেমন, হালে দেখা গিয়েছে, এক মন্ত্রক কী করবে, তা অন্য মন্ত্রক জানে না! হাতেগরম উদাহরণ, গম রফতানি নিয়ে ‘ডিগবাজি’!
এপ্রিলের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বললেন, ভারতের ভাঁড়ারে এত গম আছে যে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরে এই দেশ এখন পুরো বিশ্বকে খাওয়াতে পারে। অনেকে ধন্য ধন্য করল। তার পরে এ মাসের মাঝামাঝি আবার ঘোষণা, এক কোটি টন গম রফতানি করবে ভারত। খাদ্য জুগিয়ে যেন ভারত ‘বিশ্বগুরুর’ আসনে। অথচ তার ঠিক দু’দিন পরেই ভোল পাল্টে ফেলল দিল্লি। জানাল, যাদের কথা দেওয়া হয়ে গিয়েছে, তাদের ছাড়া এই মুহূর্তে নতুন করে আর কোনও দেশে গম রফতানি করা চলবে না!
কেন? বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এ বার প্রবল গরম পড়েছে। পঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের অনেক জায়গায় যে তাপমাত্রা দেখা গিয়েছে, বিগত  শতকে তার নজির নেই। তার জেরে গম উৎপাদনের পরিমাণ ও উৎপাদিত গমের গুণমান কমেছে। এক কিলোগ্রাম গম থেকে যেখানে ৭৭০ গ্রাম আটা মিলত, সেখানে আজ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭২০ গ্রাম। ফলে আরও গম বাইরে পাঠালে, দেশে সঙ্কট তৈরি হতে পারে। প্রায় প্রত্যেক দেশ ভারতের নীতি বদলের নিন্দা করেছে। একটি দেশ ছাড়া, তার নাম চিন! প্রশ্ন হল, গম রফতানির কথা ঘোষণার আগে সরকার কি বাস্তব পরিস্থিতি জানত না?
যখন খাবারের জিনিসের দাম বাড়ে, তখন তার প্রভাব সব থেকে বেশি পড়ে গরিব পরিবারগুলির উপরে। এমনিতেই তাদের রোজগারের বড় অংশই চাল-ডাল-চিনি-তেলের সংস্থান করতে চলে যায়। তার উপরে এক নাগাড়ে দর বাড়লে, পাতে খাবারটুকু জোগানোও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত যদি আবার রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম হয় হাজার টাকা (সম্প্রতি যদিও শুধু উজ্জ্বলা প্রকল্পভুক্তদের জন্য ২০০ টাকা ভর্তুকি ফেরানোর কথা বলা হয়েছে)।
একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বের ২০০টি দেশে প্রায় সর্বত্র ধনী-দরিদ্রের মধ্যে আর্থিক অসাম্য বাড়ছে। কিন্তু সেই অসাম্যের নিরিখেও ভারত এই মুহূর্তে কার্যত দুনিয়ায় শীর্ষে। তাই বাধ্য হয়ে এখন খাদ্যপণ্যের দরে লাগাম টানতে মরিয়া পদক্ষেপ করছে ভারত সরকার। ভাল কথা। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই চেষ্টা কি অনেক আগে থেকে করা উচিত ছিল না? দরকার ছিল না প্রয়োজনে ধনীদের উপরে আয়করের হার আপাতত বাড়িয়েও অপ্রত্যক্ষ করের (জিনিসপত্র কিংবা পরিষেবা কেনার সময়ে যা সকলকে সমান হারে গুনতে হয়) বোঝা কমানো? মনে রাখা দরকার ছিল না কি যে, আয়ের বেশি শতাংশ খরচ করতে বাধ্য হন দরিদ্ররাই? সরকারের কি খেয়াল আছে, বেকারত্বের হার কত চড়া? এই দেশে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ, যাঁরা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, তাঁদের অনেকের যে এখন পেট চালানোই দায়, তা নরেন্দ্র মোদী জানেন তো?
জ্ঞানবাপী মজজিদ কিংবা মথুরার ইদগায় প্রার্থনাকারীদের ধর্ম বদলালে, তাতে পেট ভরবে কি?

Featured Book: As Author
Gas Wars
Crony Capitalism and the Ambanis
Also available:
 
Featured Book: As Publisher
Kashmir
A Noble Tryst in Tatters