বাজেট ২০২৬: লাভবান আম্বানি-আদানি! বঞ্চিত সাধারণ মানুষ?

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের ২০২৬-২৭ সালের বাজেটকে কেবল "চমকহীন" বা "নিষ্প্রভ" বলাটা বোধহয় কম বলা হবে। যারা ভাবছেন যে তিনি  জনপ্রিয়তার পথে না হেঁটে ভালো করেছেন, তাদের সেই খুশি হয়তো বেশিদিন টিকবে না। পি. চিদম্বরমের সমান ৯টি বাজেট পেশ করার পর, তিনি এখন মোরারজি দেশাইয়ের ১০টি বাজেট পেশ করার রেকর্ড ভাঙার পথে। তবে সেটা তখনই সম্ভব হবে, যদি তিনি তার পদে টিকে থাকেন এবং নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০২৯ সালের মে মাস পর্যন্ত তাদের তৃতীয় মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে। যাই হোক, কে কতগুলো বাজেট পেশ করলেন, তা দিয়ে বাজেটের গুণমান বিচার করা যায় না।

গত ছয় বছরের মধ্যে বাজেটের দিনে শেয়ার বাজারের সবচেয়ে করুণ অবস্থার (যাকে বলা হচ্ছে 'ব্লাডি সানডে') পর বাজার এখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এমন কোনো বড় ঘোষণা দেননি যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াবে, নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে, ট্যাক্স বা রাজস্ব আদায় বাড়াবে কিংবা ঋণের বোঝা কমাবে। এই বাজেট পরোক্ষভাবে সরকারের অন্তত তিনটি বড় প্রকল্পের ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়েছে: প্রধানমন্ত্রীর ইন্টার্নশিপ স্কিম, প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ (PLI) এবং গ্রামীণ পরিবারে বিশুদ্ধ জল পৌঁছে দেওয়ার 'জল জীবন মিশন'।

ইন্টার্নশিপ স্কিম: চলতি বছরে এই খাতে যা বাজেট ধরা হয়েছিল (১০,৮৩১ কোটি টাকা), সংশোধিত হিসাবে দেখা যাচ্ছে খরচ হয়েছে তার অর্ধেকেরও কম।

PLI স্কিম: অটোমোবাইল সেক্টর ছাড়া অন্য কোথাও এই প্রকল্প তেমন কাজে না আসায় এর বরাদ্দ ৩ শতাংশ কমানো হয়েছে।

জল জীবন মিশন: এই প্রকল্পের সংশোধিত বরাদ্দ ২৭,০০০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে সোজা ১৭,০০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

সরকার তার ঋণের বা ধারের জন্য এখন পুরোপুরি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) এবং সরকারি সংস্থাগুলোর (PSU) উপর নির্ভরশীল। সরকার ট্যাক্স ছাড়া যে আয় করবে, তার প্রায় অর্ধেকটাই আসবে RBI-এর ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ থেকে। আশ্চর্য  বিষয় হলো, ইন্ডিয়ান অয়েল বা ওএনজিসি-র মতো লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোর চেয়েও এখন RBI সরকারকে বেশি টাকা জোগাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ভয়, সরকারকে এই লভ্যাংশ দিতে গিয়ে সরকারি কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব মূলধনী খরচ (Capital Expenditure) কমিয়ে দেবে। এটা আসলে এক পকেট থেকে টাকা বের করে অন্য পকেটে রাখার মতোই ব্যাপার, যা অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো খবর নয়।

সরকারি শেয়ার বিক্রি বা বিলগ্নিকরণও (Disinvestment) খুব ধীর গতির। চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭২ শতাংশ অর্জিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও, আগামী ২০২৬-২৭ সালের জন্য এই শেয়ার বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৮০,০০০ কোটি টাকা করা হয়েছে—যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথম বৃদ্ধি।

সরকারের মোট কর বা ট্যাক্স আদায় বাজেটের অনুমানের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কম। জিডিপি-র অনুপাতে কর আদায়ের হারও কমেছে। অর্থনীতিবিদ রথীন রায় উল্লেখ করেছেন যে, মহামারীর সময়টুকু (২০২০-২২) বাদ দিলে, ২০১৬-১৭ সাল থেকে জিডিপি-র অনুপাতে সরকারের মোট খরচ আসলে এক জায়গায় থমকে আছে।

এই প্রথমবার জিএসটি (GST) সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে জিএসটি-র হার কমানোর পর আশা করা হয়েছিল মানুষের কেনাকাটা বাড়বে এবং তাতে কর আদায়ও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তার পরিবর্তে, গত এক দশকের মধ্যে সাধারণ পরিবারের ঋণের পরিমাণ এখন সর্বোচ্চ।

ধনীদের করের পরিমাণ না বাড়িয়ে ঋণের মাধ্যমে ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণমূলক খাতে খরচ কমাতে হচ্ছে। অবশ্য এই সরকারের নব্য-উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতির ধরন দেখে এতে খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু নেই।

গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের বরাদ্দ বেশ কৌতূহল জাগায়। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (MGNREGA বা মনরেগা) বাতিল করে শীতকালীন অধিবেশনে আনা হয়েছে নতুন আইন—‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা VB G RAM G। মনরেগার মতোই এর সংশোধিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৮,০০০ কোটি টাকা এবং আগামী বছরের জন্য অতিরিক্ত ৩০,০০০ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। তবে এই টাকা দিয়ে বছরে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে সরকার গ্রামে কাজ দেওয়া এবং সারের ভর্তুকিতে বড় কোনো কাটছাঁট করতে পারছে না। গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেদের খরচের ভাগ ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬০ শতাংশ করেছে (যা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকে অসন্তুষ্ট করেছে বলে শোনা যাচ্ছে)। তবুও ২০২৬-২৭ সালে এই নতুন প্রকল্পের জন্য ৯৫,৬৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সোজা কথায়, সরকার গ্রামীণ মানুষের অসন্তোষের ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

বাজেটে যে একদমই ভালো কিছু নেই, তা বললে ভুল হবে। বিরল খনিজ পদার্থ (Rare earth minerals) এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির ক্ষেত্রে দেশের দুর্বলতাগুলো সরকার মেনে নিয়েছে। এছাড়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME)—বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের মতো জায়গাগুলোতে যে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে, তা বাজেটে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, গরিব মানুষের রান্নার গ্যাস (LPG) এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দে যে কাটছাঁট করা হয়েছে, তা এককথায় অমানবিক।

বাজেট বক্তৃতার একটি ঘোষণা খুব একটা নজরে পড়েনি, অথচ এটি ভারতের শীর্ষ দুই ধনী ব্যক্তিকে আরও ধনী করে তুলবে। ২০৪৭ সাল পর্যন্ত গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ভারতে ডেটা সেন্টার ব্যবহারের জন্য যে কর ছাড় (Tax holiday) দেওয়া হয়েছে, তার আসল সুবিধা পাবেন মুকেশ আম্বানি এবং গৌতম আদানির মতো ব্যবসায়ীরা। কারণ, তাদের কোম্পানিগুলোই এই ডেটা সেন্টার ব্যবসায় বিপুল বিনিয়োগ করছে।

Two cheers for Nirmala Sitharaman!!

Featured Book: As Author
Flying Lies?
The Role of Prime Minister Narendra Modi in India's Biggest Defence Scandal
Also available:
 
Featured Book: As Publisher
The Dark Side of News Fixing
The Culture and Political Economy of Global Media in Pakistan and Afghanistan
  • Authorship: Syed Irfan Ashraf
  • Publisher: AuthorsUpFront, Paranjoy
  • 252 pages
  • Published month:
  • Buy from Amazon