আমরা আজ এইসব নিয়ে এত কথা কেন বলছি? তার কারণ আজ এই মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে অনিল আম্বানি সেইসময় প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী বার্তাবহ হিসেবে কাজ করেছিলেন। সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে অনিল আম্বানির এপস্টাইনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁর নিজস্ব ব্যাবসায়িক সফলতার সূত্রগুলি আমাদের সামনে গোটা বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলে। এপস্টাইনের সাহায্যে অনিল যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত মার্কিন সরকারের উপদেষ্টা এবং ট্রাম্পের জামাই জারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের সহ-রিপাবলিকান স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে দেখা করেন। এই সাক্ষাৎগুলি ওয়াশিংটনে মোদির প্রথম সফরের আগে তাঁর সফরের সুযোগ ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য জরুরি ছিল। এপস্টাইন বারবার অনিল আম্বানিকে উল্লেখ করছেন ‘his guy’ হিসেবে, এই ‘he’ যে কে তা আমাদের স্পষ্ট করে কেউ বুঝিয়ে না দিলেও আমরা বুঝে নিতে পারি। এপস্টাইন ফাইল আরও বলছে, অনিল আম্বানি বলতেন যে যেহেতু চিন ভারতের শত্রু, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্টের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখাটা দরকার। বলা বাহুল্য, আমাদের বিদেশমন্ত্রক এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে, এবং সবটাই একজন ‘শাস্তিপ্রাপ্ত দাগী অপরাধীর অর্থহীন অবান্তর প্রলাপ’ বলে নস্যাৎ করে দিয়েছে।
পাশাপাশি, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিই ইজরায়েল সফরে যান, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। তখন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। এখনও তিনিই সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। এপস্টাইনের ফাইল অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে মোদির ইজরায়েল সফর করানো হয়েছে, এবং নরেন্দ্র মোদি যে ওখানে গিয়ে খুব গেয়েছেন ও নেচেছেন (‘singing and dancing’) তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুশি। আমরা জানি না ‘singing and dancing’ কোনও কোড ওয়ার্ড কিনা, তবে এপস্টাইনের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে ঠিক সেই সময়কালের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েল সফর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। যদিও বিদেশমন্ত্রক যথারীতি বিবৃতি দিয়েছে যে এই তথ্যগুলি সর্বৈব মিথ্যা। তাছাড়া আজ আর অনিল আম্বানি মোদি সরকারের কাছের মানুষদের মধ্যে একজন নয়, হাজার হাজার কোটি ব্যাঙ্কের টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে ফেরত দিতে না পারার জন্য তাঁর ও তাঁর ছেলের ঘরে সরকারি আধিকারিকরা রেইড করছেন। ফলত, অনিল আম্বানির মুখও এখন বন্ধ থাকবে।
তবে এপস্টাইন ফাইলে নাম আছে এমন আরেকজন এখনও সরকারের কাছের লোক। তিনি বতর্মানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি। হরদীপ ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসে থাকাকালীন নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। যেমন তাঁর শেষতম পদটি ছিল জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি (India’s Permanent Representative to the United Nations)। ২০১৪-তে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি অবিলম্বে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন এবং খুব শীঘ্র মোদিজির কাছের লোক হয়ে ওঠেন। এ-হেন হরদীপ সিং পুরি কমপক্ষে তিনবার এপস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এ বিষয়ে হরদীপের বক্তব্য তিনি দেশে বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছিলেন, এবং লিঙ্কড-ইনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানকে এ-দেশে আনার চেষ্টা করেছিলেন। যাই হোক, তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র এপস্টাইন ফাইলের প্রেক্ষিতে হরদীপ সিং পুরি ও এপস্টাইন দ্বীপে তাঁদের ফূর্তির উল্লেখ করে একটি টুইট করেন। মহুয়ার দাবি হরদীপ একটু পরেই মহুয়াকে ফোন করে টুইটটি মুছে দেওয়ার কথা বলেছেন, না-হলে ফল খারাপ হতে পারে এবং তিনি তখন আর মহুয়াকে কোনও সাহায্য করতে পারবেন না। শ্রীমতী মহুয়া মৈত্র হরদীপের এই ফোনকলকে ‘প্রচ্ছন্ন হুমকি’ আখ্যা দিয়ে আবার সমাজমাধ্যমে লিখলেন।
এছাড়াও এপস্টাইন ফাইলে প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক, যশবর্ধন কুমার সিনহারও নাম উঠে এসেছে। এপস্টাইন ফাইল অনুযায়ী ভারতীয় দূতাবাসের জনৈক ওয়াইকে সিনহা এপস্টাইনের কাজের সঙ্গে ভালোরকম পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমেই ব্রিটিশ রাজকুমার প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও এপস্টাইনের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। যশবর্ধন আপাত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন, “দ্বীপভূমিতে এপস্টাইনের ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জনৈক ওয়াইকে সিনহার নাম যুক্ত করে সমাজমাধ্যমে খবর ছড়ানো হচ্ছে। আমি এ-কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার মনে করছি যে আমি ব্রিটেনে ২০১৬ থেকে ২০১৮ অব্দি ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলাম ঠিকই, কিন্তু টুইটারে ওয়াইকে সিনহা হিসেবে উল্লেখিত মানুষটি আমি নয়, অন্য কেউ। আমি জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্কও অস্বীকার করছি।”
এপস্টাইন ফাইলের তথ্যগুলির ওপর ভিত্তি করে এখন সারা পৃথিবীর নানা দেশে চর্চা চলবে। কোথাও কোথাও নতুন করে তদন্ত শুরু হবে। আবার কোথাও তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলবে। আপাতত, এপস্টাইন ফাইলের দৌলতে পাওয়া তথ্যগুলির সত্যতা যাচাই করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে প্রাপ্ত তথ্যগুলি থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে নানা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও একটা জিনিস নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রাচীন যুগের মতো এই যুগেও অর্থ এবং ক্ষমতার লোভ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। আমাদের দেশের ইতিহাসে অর্থ, প্রতিপত্তি ও যৌনতা অনেক বড় বড় সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ণয় করেছে, আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও এই তিনের ককটেল একইরকম শক্তিশালী ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।