ভারতের নতুন বস্ত্র নীতি: রিলায়েন্সের চাপে ধুঁকছে ছোট শ্রমিকরা?

মনো ইথিলিন গ্লাইকোল (MEG), ভারতের মানুষের তৈরি ফাইবার শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। এই মনো ইথিলিন গ্লাইকোলকে ঘিরে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে তা দেশের বস্ত্রশিল্পের ভিত কাঁপিয়ে দিতে চলেছে। দেশে MEG-এর চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বিশাল ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও, সরকারের একটি প্রস্তাবিত নীতি এই সংকটকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে। এতে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ঝুঁকে পড়তে পারে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের দিকে, আর বিপদের মুখে পড়তে পারেন হাজার হাজার ছোট নির্মাতা ও তাদের উপর নির্ভরশীল কোটি মানুষ।

১. পলিয়েস্টারের ক্ষমতার খেলা

ভারতের নানা ধরনের শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে বস্ত্রশিল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নানারকম ঝুঁকিও থাকে। এই শিল্পই দেশের মানুষের পোশাকের জোগান দেয়, লক্ষ লক্ষ মানুষকে কাজের সুযোগ দেয় এবং রফতানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও মজবুত করে। কৃষির পর বস্ত্রশিল্পই ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে।

এই শিল্পের আড়ালে এখন এক বড় লড়াই চলছে। হাজার হাজার ছোট নির্মাতা টিকে থাকার জন্য লড়ছেন একটি শক্তিশালী কর্পোরেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এই গোষ্ঠীর মূলে রয়েছে মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (RIL)। তাদের সঙ্গে আছে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC) এবং ভারতীয় গোষ্ঠীর ইন্ডিয়া গ্লাইকোলস লিমিটেড (IGL)।

এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে আছে একটি বর্ণহীন, গন্ধহীন, ঘন তরল— মনো ইথিলিন গ্লাইকোল (MEG)। সাধারণ মানুষের কাছে এটি হয়ত অচেনা একটি রাসায়নিক নাম। কিন্তু ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের জন্য MEG খুবই জরুরি কাঁচামাল। এটি না থাকলে সুতো তৈরি বন্ধ হয়ে যায়, আর তাঁতের কাজও থেমে যায়।

কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের ভবিষ্যৎ কি RIL ও IOC-র মতো কয়েকটি বড় সংস্থাই ঠিক করবে? উত্তরটা স্পষ্ট, না।

DGTR কী করতে চাইছে?

এই প্রতিবেদনে DGTR-এর একটি সাম্প্রতিক সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেই সুপারিশে MEG আমদানির উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি (ADD) বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। DGTR কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনে থাকা একটি সংস্থা, যা ADD, CVD, সেফগার্ডস ডিউটি (SGD) এবং পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা (QRs)-এর মতো বিষয়গুলি একসঙ্গে দেখভাল করে।

আধা-বিচারিক সংস্থা হিসেবে DGTR নিজে তদন্ত করে এবং তারপর তার সুপারিশ অর্থ মন্ত্রকে পাঠায়।

এই দফতরের কাজ হলো, বিদেশি সংস্থাগুলি যা অন্যায্যভাবে কম দামে বা ভর্তুকি দিয়ে পণ্য বিক্রি করে দেশের শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, এবং সবাই সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে তা নিশ্চিত করা। এ জন্য তারা WTO-র নিয়ম, দেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ভিত্তিতে বিভিন্ন বাণিজ্য-সংশোধনী ব্যবস্থা নেয়। DGTR–এর কাছ থেকে আশা করা হয়, তারা স্বচ্ছভাবে ও সময়মতো কাজ করবে। আর অন্য দেশ যখন ভারতীয় সংস্থা বা রফতানিকারকদের বিরুদ্ধে এমন তদন্ত শুরু করে, তখন তাদের সহায়তা করাও DGTR–এর দায়িত্ব।

DGTR কতটা কার্যকর এবং প্রভাবশালী লবির চাপের কাছে কতটা নতি স্বীকার করে, তা এই প্রতিবেদন পড়লেই বোঝা যাবে। এই লেখা তৈরির জন্য ২০২৪ ও ২০২৫ সালের নানা চিঠিপত্র, শিল্পমহলের বক্তব্য, আইনি নথি এবং বিস্তারিত দামের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই তথ্যগুলিতে দেখা যাচ্ছে, নিয়ম-কানুনকে কৌশলে ব্যবহার করে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তথ্য বলছে, দেশের বৃহত্তম MEG উৎপাদক রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (RIL)-এর সুবিধার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করছে, আর এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলি (MSMEs)।

২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর DGTR প্রস্তাব দেয়, কুয়েত, সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি হওয়া MEG-এর উপর প্রতি মেট্রিক টনে ১০৩ থেকে ১৩৭ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হোক। এই প্রস্তাব ঘিরে শিল্পমহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। PTAIA-সহ প্রায় পনেরোটি শিল্পসংগঠন বলছে, এই সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্য বিষয় নয়; পলিয়েস্টার ফাইবার ও কাপড় তৈরি করা ছোট নির্মাতাদের জন্য এটি বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এই শুল্ক বসলে GST-এর জন্য পাওয়া সাম্প্রতিক সুবিধাগুলি আর পাওয়া যাবে না, সরকারের PLI প্রকল্পের গতি নষ্ট হবে এবং ২০,০০০ কোটির বেশি পরিকল্পিত বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এই প্রতিবেদনে দেশীয় শিল্পের তোলা ‘ক্ষতির’ দাবিগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে সরকারের রফতানি লক্ষ্য ও সুরক্ষামূলক বাণিজ্য বাধার মধ্যে থাকা স্পষ্ট অসামঞ্জস্যটি তুলে ধরা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার দেশগুলির উপর শুল্ক বসালে কূটনৈতিকভাবে কী প্রভাব পড়তে পারে এবং কর্পোরেট একচেটিয়ায় সাধারণ মানুষের কী ক্ষতি হয়, তাও সহজভাবে বোঝানো হয়েছে। এই শুল্কের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে, ১৯৮০-র দশকের ‘পলিয়েস্টার প্রিন্স’ ঘটনার কথা বলা হয়েছে। 

তিরুপ্পুর থেকে টেলিগ্রাম

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর একটি ইমেল থ্রেড ঘুরতে শুরু করে। ইমেলটি ভারতীয় বস্ত্র উৎপাদন ইউনিটগুলির একাংশে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ককে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ইমেলের শিরোনাম ছিল আমলাতান্ত্রিক ভাষায় ভরা, ফরওয়ার্ড:ডিজিটিআর (DGTR)-এর ২৩/০৯/২০২৫ তারিখের ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ (Final Findings) যেন অর্থ মন্ত্রক অনুমোদন না করে, সেই বিষয়ে আপনার সমর্থন ও সুপারিশের জন্য অনুরোধ রইল (“Fwd: Request for your kind support & recommendation to the Ministry of Finance not to approve DGTR’s Final Findings dated 23/09/2025”)। ইমেলের বার্তাটি ছিল খুবই উদ্বেগের। সেখানে PTAIA–র একজন প্রতিনিধি জরুরি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আসলে এটি ছিল সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা, যা ৩,৫০০–এর বেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত একটি পুরো শিল্পখাতকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই ছিল ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME)।

এই খাতের কাঠামো (গ্রাফিক ২ দেখুন) সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে ১১ নভেম্বর কেন্দ্রীয় রাজস্ব সচিব অরবিন্দ শ্রীবাস্তবকে পাঠানো একটি চিঠিতে, যার একটি কপি লেখকদের কাছে রয়েছে।

চিঠিতে ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকে পাঠানো আরেকটি চিঠির উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছিল, MEG–এর উপর বড় অঙ্কের অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি (ADD) বসানোর যে DGTR–এর সুপারিশ (F. No. 6/34/2024-DGTR), তা যেন গ্রহণ না করা হয়।

এই অনুরোধের সময়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে বস্ত্রশিল্প শুধু কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে নয়; দেশের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট ইউনিট গুলোও এই খাতকে সচল রাখে। সারা দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে— বিশেষ করে গুজরাটের সুরাট, পাঞ্জাবের লুধিয়ানা, তামিলনাড়ুর তিরুপ্পুর ও ইরোডে-তে পাওয়ারলুম মালিক, সুতা প্রস্তুতকারক, নিটিং ইউনিট ও পোশাক প্রস্তুতকারকরা কাজ করেন।

এই ইউনিটগুলির বড় পুঁজি বা বহুমুখী ব্যবসাও নেই। তারা খুবই কম লাভের মার্জিনে কাজ করে, অনেক সময় ৭-৮ শতাংশের মতো। এই MSME-গুলির জন্য কাঁচামালের খরচ শুধু খরচের তালিকার একটি অংশ নয়; বরং টিকে থাকার মূল ভরসা।

খরচের হিসাব

ম্যান-মেড ফাইবার, বস্ত্র ও পোশাক তৈরির খাতে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তা বুঝতে হলে 'আধুনিক ফ্যাশন'-এর পেছনের গল্পটাও সহজভাবে জানা দরকার। পলিয়েস্টার হলো এমন একটি তন্তু, যা আজকের বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের পোশাক তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়— খেলোয়াড়দের স্পোর্টসওয়্যার থেকে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী দৈনন্দিন পোশাক সবটাই এর উপর নির্ভর। এটি তৈরি করা হয় একটি বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পিউরিফায়েড টেরেফথ্যালিক অ্যাসিড (PTA) এবং MEG-এর বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই পলিমার তৈরি করা হয়।

এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কত পরিমাণ উপাদান থেকে কত পরিমাণ পণ্য তৈরি হবে— এটি খুব সঠিকভাবে ঠিক করতে হয়। পলিয়েস্টার তৈরি করতে ওজনে প্রায় ৭০% PTA এবং ৩০% MEG লাগে। ২০২০ সালে শেষ হওয়া লড়াই PTA-এর সরবরাহ ও মূল্যকে স্থিতিশীল করেছে। কিন্তু MEG এখন আবার নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। এটি উৎপাদনের হিসাবের সবচেয়ে পরিবর্তনশীল উপাদান।

ভারতের বস্ত্রশিল্প এই রাসায়নিকের বড় ভোক্তা। PTAIA–র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বস্ত্রশিল্প বছরে প্রায় ৩১ লাখ মেট্রিক টন (MT) MEG ব্যবহার করে। কিন্তু দেশের উৎপাদন ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। দেশীয় প্রস্তুতকারকরা বছরে মাত্র ১৯.৪১ লাখ MT MEG উৎপাদন করে, ফলে প্রায় ১১.৫৯ লাখ MT–এর ঘাটতি থাকে; প্রায় ৪০ শতাংশ অভাব, যা শুধুমাত্র আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা যায়।

এই ঘাটতি কোনো সাময়িক সমস্যা নয়; এটি ভারতের পেট্রোকেমিক্যাল খাতের একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। ছোট শিল্পগুলি কাঁচামালের জন্য আমদানির উপর নির্ভর করে, বিদেশি পণ্য পছন্দের কারণে নয়, প্রয়োজনীয়তার কারণে। এই আমদানি না থাকলে কারখানাগুলি কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে যেত।

যে ধাক্কা আসতে চলেছে

DGTR–এর প্রস্তাব অনুযায়ী, কুয়েত, সৌদি আরবের স্যাবিক এবং সিঙ্গাপুরের কয়েকটি সংস্থার আমদানি পণ্যের উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানো হলে, ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা ভারসাম্য আরও নড়বড় হয়ে যেতে পারে। প্রস্তাবিত শুল্কগুলি যথেষ্ট বড়: কুয়েত প্রতি MT $103, স্যাবিকে $113, এবং সিঙ্গাপুরের সংস্থাগুলিতে $137। টাকার হিসেবে, এর মানের কাঁচামালের খরচ প্রতি কেজি প্রায় ₹৯–১২ বৃদ্ধি পাবে। এমন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে লুধিয়ানার খুব কম লাভে কাজ করা ছোট সুতো প্রস্তুতকারকের জন্য, কাঁচামালের দাম হঠাৎই ১২ টাকা বেড়ে যাওয়া বা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া তাঁর ব্যবসার জন্য অনেক বড় ধাক্কা।  

ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ ও চিনের বস্ত্র ও পোশাক নির্মাতাদের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতা থাকা বাজারে, ক্রেতারা সামান্য দাম পার্থক্য থাকলেও সরবরাহকারী বদলায়। এই পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম ২০% বেড়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধাক্কা। PTAIA–র কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকে পাঠানো চিঠিতে সতর্ক করা হয়েছে, 

কাঁচামালের খরচ বাড়লে কারখানা বন্ধ করতে হবে… এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যাবে না।

মানুষের কাছে MEG–এর উপর শুল্কের অর্থ হলো: কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তাঁত শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হাজার হাজার শ্রমিকের চাকরি চলে যাওয়া।

২.ডেভিড বনাম গোলিয়াথ

এই ধরনের ক্ষতিকারক প্রস্তাব কেন করা হচ্ছে তা বুঝতে হলে গভীরে যেতে হবে। প্রথমে দেখা দরকার, DGTR–এর প্রস্তাব থেকে কে সুবিধা পাবে।

ভারতে MEG–এর দেশীয় উৎপাদন কয়েকটি বড় কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে। দেশে কেবল তিনটি প্রধান MEG উৎপাদক রয়েছে: রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড এবং ইন্ডিয়া গ্লাইকোলস লিমিটেড।

এর মধ্যে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (RIL) স্পষ্টভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী। এটি শুধু দেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদক নয়; এটি একটি বিশাল কোম্পানি যা পুরো পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। RIL তাদের উৎপাদনের সব ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে— কাঁচা তেল পরিশোধন থেকে শুরু করে, ন্যাফথা ক্র্যাকিং, ইথিলিন উৎপাদন, MEG তৈরি, পলিয়েস্টার ফাইবার ও কাপড় তৈরি পর্যন্ত।

ভারতের পেট্রোকেমিক্যাল বাজারে একটি বড় সমস্যা হলো 'ক্যাপটিভ কনজাম্পশন' বা নিজের উৎপাদন নিজেরাই ব্যবহার করা। RIL এখানে অনন্য: এটি শুধু দেশের সবচেয়ে বড় MEG উৎপাদক নয়, সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারীদের মধ্যেও একটি। কোম্পানিটির প্রায় ৬০% MEG নিজের উৎপাদন ব্যবহার করে নিজের পলিয়েস্টার পণ্য বানানোর জন্য।

এই কাঁচামালের স্থানান্তর হয় অস্পষ্ট দামে। এতে RIL বড় সুবিধা পায়। তাই RIL সরকারকে ‘ডাম্পিং’ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার আবেদন জানিয়ে, দাবি করে কম দামে আমদানিতে দেশীয় শিল্পের ক্ষতি করছে।

ডাম্পিং বলতে বোঝায়, কোনো কোম্পানি বিদেশে পণ্য বিক্রি করছে নিজের দেশের দামের চেয়ে কম দামে, এমনকি কখনও উৎপাদন খরচের থেকেও কম দামে। এই বাণিজ্য পদ্ধতিকে অন্যায় হিসেব গণ্য করা হয়, কারণ এতে আমদানিকারক দেশের উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডাম্পিংয়ের ফলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় অনেক দেশ শুল্ক ও কোটা বসায়।

ভারতে RIL যে ক্ষতির কথা বলছে, তা পুরোপুরি বাস্তব নাও হতে পারে, কারণ তারা নিজেদের উৎপাদনের প্রায় ৬০% নিজেরাই ব্যবহার করে। আসলে বেশি দামের চাপে পড়ছেন বস্ত্রশিল্পের ছোট ও মাঝারি সুতো প্রস্তুতকারক ও তাঁত মালিকরা, যাদের বাজার থেকেই MEG কিনতে হয়।

সরকার যদি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে, তাহলে খোলা বাজারে MEG-এর দাম বেড়ে যাবে— আমদানির খরচ ও শুল্ক যোগ হয়ে যে দাম দাঁড়াবে, সেটাই বাজারদর হবে। এতে তৃতীয় পক্ষের কাছে MEG বিক্রি করে RIL বেশি লাভ করবে। পাশাপাশি, RIL–এর নিজস্ব কারখানাগুলি নিজেদের তৈরি MEG ব্যবহার করায় কাঁচামাল পাবে প্রায় উৎপাদন খরচের দামে।

এই সিদ্ধান্তে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাবে এবং দুই দিকেই প্রভাব পড়বে। একদিকে, এতে বড় কোম্পানিগুলি বাড়তি সুবিধা পাবে। শুল্কের কারণে কাঁচামাল বেশি দামে বিক্রি করে তারা সেই লাভ দিয়ে নিজেদের অন্য ছোট ব্যবসাও চালাতে পারবে। অন্যদিকে, ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীরা বেশি দামে কাঁচামাল কিনলে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে, এতেও বড় কোম্পানিগুলির লাভ। তাই প্রশ্ন ওঠে, RIL কেন অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপে এত আগ্রহী?

'পলিয়েস্টার প্রিন্স'— আবারও সেই কৌশল

মুকেশ আম্বানির কোম্পানির এই কৌশল নতুন নয়; আগেও তারা এমন পথে এগিয়েছে। ‘পলিয়েস্টার প্রিন্স’ নামে পরিচিত ঘটনাটি আসলে রিলায়েন্সের উত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ধীরুভাই আম্বানি (১৯৩২–২০০২) প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবসা দ্রুত বড় হয়েছিল এমন এক শুল্ক ব্যবস্থার সুবিধায়, যেখানে দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দেওয়া হতো এবং আর আমদানি কমানোর চেষ্টা করা হতো। 

১৯৮০-এর দশকে কর্পোরেট ভারতের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল ধীরুভাই আম্বানি ও বম্বে ডাইং-এর প্রধান নুসলি ওয়াদিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ। দু’জনেই কৃত্রিম তন্তু ভিত্তিক বস্ত্রশিল্পের বড় উদ্যোক্তা ছিলেন এবং একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হামিশ ম্যাকডোনাল্ডের লেখা ধীরুভাই আম্বানির জীবনী 'The Polyester Prince'–এ এই দন্দ্ৱের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে বইটি ভারতে ১৩ বছর পাওয়া যায়নি। পরে ২০১০ সালে এটি সংশোধিত রূপে প্রকাশিত হয়— ভারতে 'Ambani & Sons' নামে এবং আন্তর্জাতিক সংস্করণে 'Mahabharata in Polyester' নামে। অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক ম্যাকডোনাল্ড তাঁর বইয়ে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে পলিয়েস্টার তন্তু তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির নিয়ম সরকার বদলেছিল, যা রিলায়েন্স গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের অসুবিধায় ফেলে। এই ঘটনাই যেন বারবার নতুন করে ফিরে আসছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে Economic and Political Weekly–তে প্রকাশিত “Polyester Prince 3.0: Close Encounters of the Third Kind” শিরোনামের এক প্রবন্ধে সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা দেখিয়েছিলেন, প্রায় একই ধরনের ঘটনা ১১ বছর আগে ঘটেছিল। ২০১৪ সালে পলিয়েস্টার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান PTA–কে ঘিরে বড় বিতর্ক হয়। আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সরকার PTA–র উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসায়। ফলে বহু বছর ধরে শিল্পে কাঁচামালের খরচ অনেকটাই বেশি থাকে। অবশেষে ২০২০ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এই শুল্ক তুলে নেন। তিনি স্বীকার করেন, জনস্বার্থে কাঁচামাল সাশ্রয়ী দামে পাওয়া খুব জরুরি।

২০২০ সালের পর লড়াইয়ের কেন্দ্র PTA থেকে সরে এসে MEG–এ পৌঁছায়। তবে পরিস্থিতি এখনও বদলায়নি। WTO–র নিয়মে থাকা ‘দেশীয় শিল্পের ক্ষতি’ যুক্তিকে ব্যবহার করে সুরক্ষামূলক শুল্ক আনার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে যেসব ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীর নিজস্ব কারখানা নেই, তাদের লাভ কমে যায় এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ বড় কোম্পানির হাতে আরও শক্ত হয়ে যায়।

মূল্যবৃদ্ধি

অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানোর আইনি ও অর্থনৈতিক যুক্তি হলো, বিদেশি কোম্পানিগুলি খুব কম দামে পণ্য বিক্রি করে, ফলে দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু তথ্য বলছে, কম দামের প্রলোভনের কারণে নয়— দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন না থাকায় বাধ্য হয়েই আমদানি করতে হয়।

প্রায় ১২ লাখ টনের চাহিদা-জোগানের ঘাটতি থাকায়, দেশের MEG উৎপাদকরা মোট চাহিদা মেটাতে পারেন না। তাই বস্ত্র ও পোশাক শিল্প সচল রাখতে আমদানি খুবই জরুরি। আমাদের মত, এবং PTAIA, CITI-সহ বস্ত্র ও পোশাক প্রস্তুতকারকদের একাধিক সংগঠনের মত হলো— MEG-এর আমদানিতে শুল্ক বসিয়ে সরকার আসলে দেশীয় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পকে রক্ষা করছে না, বরং সরকার ঘাটতির উপরেই শুল্ক বসাচ্ছে। কারণ তারা ইতোমধ্যেই তাদের উৎপাদন ক্ষমতা পুরো ব্যবহার করছে। এর ফলে এমন এক মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার কোনো বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজন নেই। এতে লাভবান হয় কেবল বড় উৎপাদক সংস্থাগুলি, যেমন RIL, IOC এবং IGL।

অন্যভাবে বললে, সরকারের আগের পদক্ষেপ এবং DGTR–এর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের প্রস্তাব— এগুলিতে লাভ হবে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির, আর ক্ষতি হবে MMF দিয়ে তৈরি কাপড় ও পোশাকের ভোক্তাদের।

ডাম্পিং-এর মিথ

DGTR–এর তদন্তে মূল প্রশ্ন হলো— বিদেশি কোম্পানিগুলি কি সত্যিই খুব কম দামে MEG বিক্রি করছে, নাকি তারা বেশি দক্ষ হওয়ায় তাদের পণ্য দেশীয় উৎপাদকদের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক? নিম্নস্তরের শিল্পের দেওয়া তথ্য একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে MEG–এর দামের ধারা দেখলেই বোঝা যাবে “অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি” দাবিটি সত্যিই মেনে নেওয়ার মতো কিনা। বাণিজ্য অর্থনীতিতে ‘প্রিডেটরি প্রাইসিং’ বলতে বোঝায়, একটি কোম্পানি ইচ্ছে করে খুব কম দামে, এমনকি খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে সরিয়ে দিতে চায়, যাতে পরে একচেটিয়া দখল নিতে পারে।

স্বল্প সময়ের জন্য কম দামে পণ্য পেলে ভোক্তারা কিছুটা লাভবান হতে পারেন ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, প্রতিদ্বন্দ্বীরা বাজার থেকে সরে গেলে দাম বাড়ে এবং পছন্দের সুযোগ কমে যায়। অনেক দেশে এ ধরনের কৌশল শুধু অপছন্দনীয় নয়, বেআইনি হিসেবেও ধরা হয়, কারণ এতে প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়। এমন কোম্পানির লক্ষ্য থাকে, বাজারে একচেটিয়া বা প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করে পরে দাম বাড়ানো।

২০২৫ সালের তথ্য আরও স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। ওই বছরে সৌদি আরবের স্যাবিক থেকে আসা MEG-এর গড় আমদানি মূল্য ছিল প্রতি মেট্রিক টনে ৫৩৬.৪ ডলার। যা চিনের দামের চেয়েও বেশি, এমনকি রিলায়েন্সের গড় দামের থেকেও বেশি।

এই তথ্য ‘ডাম্পিং’ তত্ত্বকে কার্যত ভেঙে দেয়। কারণ, যদি Sabic বা MEGlobal–এর মতো বিদেশি সরবরাহকারীরা রিলায়েন্সের চেয়েও বেশি দামে MEG বিক্রি করে, তাহলে ডাম্পিং হচ্ছে কোথায়? PTAIA ও CITI-র বক্তব্যও স্পষ্ট: “Sabic ও MEGlobal কোনোভাবেই RIL–এর চেয়ে কম দামে MEG বিক্রি করছে না।” এই পরিস্থিতিতে আমদানি করা MEG-এর উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানোর প্রস্তাব বাজারের বাস্তব দামের সঙ্গে মিল খায় না। এতে বোঝা যায়, দেশীয় সংস্থাগুলি যে ‘ক্ষতি’র কথা বলছে, তা কম দামে বিক্রির কারণে নয়। তাহলে DGTR–এর কাছে এত চাপ দেওয়া হচ্ছে কেন? দেশীয়ভাবে MEG উৎপাদনে RIL, IOC ও IGL-এর অদক্ষতার কারণে? নাকি শুধু বেশি মুনাফা করার কৌশল?

অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ

অভিযোগ, দেশীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দামের চেয়েও বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। তারা 'ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস' নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন, সেখানে আমদানি পণ্যের মোট খরচের (ল্যান্ডেড কস্ট) ঠিক নিচে নিজেদের দাম ঠিক করা হয়। কিন্তু যখন আমদানির উপর কাস্টমস শুল্ক বা অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক যোগ হয়, তখন আমদানির খরচ বেড়ে যায়। দেশীয় উৎপাদকরাও সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের দাম বাড়িয়ে সেই নতুন, বেশি দামের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। ফলে তাদের মুনাফাও বেড়ে যায়।

এর ফল হলো, সরকার যে প্রতিটি ডলার শুল্ক আরোপ করে, তার ভার পড়ে প্রায় ৪৮,০০০ ক্ষুদ্র ও মাঝারি বস্ত্র ও পোশাক প্রস্তুতকারক সংস্থার উপর, আর সেই অর্থ গিয়ে জমা হয় মাত্র তিনটি বড় পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির লাভের খাতায়। ২০২২ সালের ২১ অক্টোবর NewsClick–এ প্রকাশিত আয়ুষ যোশি ও আবির দাসগুপ্তের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে— অল্প কয়েকটি বড় সংস্থার লাভের স্বার্থের বিপরীতে বহু ছোট সংস্থার টিকে থাকার লড়াই চলছে।

নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে কোয়ালিটি কন্ট্রোল করা হচ্ছে

প্রস্তাবিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আলাদা কোনো পদক্ষেপ নয়; এটি ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপেরই অংশ। এর আগেই সরকার আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছিল— কোয়ালিটি কন্ট্রোল অর্ডার (QCO)। বিউরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (BIS)-এর নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি কারখানাকে ভারতীয় পরিদর্শকের সনদ নিতে হয়, তবেই তারা ভারতে পণ্য পাঠাতে পারে। নিরাপত্তা ও মানের কথা বলা হলেও, বাস্তবে QCO অনেক সময় শুল্ক ছাড়াই বড় বাণিজ্যে বাধা তৈরি করে। PTAIA জানিয়েছে, MEG–এর ক্ষেত্রে QCO প্রয়োগের কারণে 'নন-BIS' দেশ থেকে আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাসায়নিক উৎপাদক দেশ চিন থেকেও সরবরাহ অনেক কমে গিয়েছে।                                                                                                   

দামের বৃদ্ধি ও তার প্রভাব

QCO-এর প্রভাব খুবই স্পষ্ট ছিল। দেশীয় MEG উৎপাদকরা তাদের দাম প্রতি কেজি ১.৫-২.০ টাকা বাড়িয়ে দিল। দাম বাড়ার কারণ কাঁচামালের দাম নয় (কারণ সেই সময় কাঁচামালের দাম স্থির ছিল), প্রতিযোগিতা কমে যাওয়াই মূল কারণ।

এখন প্রস্তাবিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক সেই জায়গাটিই আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে, যেন সৌদি আরব, কুয়েত ও সিঙ্গাপুরের বিদেশি সরবরাহকারীরা, যারা BIS–এর মান পূরণ করেছে, তাদের বাজারে প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। (Now, the proposed ADD seeks to fortify this wall against the foreign suppliers from Saudi Arabia, Kuwait, and Singapore, who have managed to follow BIS standards.) যদি এটি কার্যকর হয়, ভারতের বস্ত্র শিল্প কার্যত বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং দেশের ঠিক করা দামের নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভরশীল হবে। এতে বোঝাই যাচ্ছে, বিদেশি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না দেশীয় উৎপাদকরা নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে ছোট উৎপাদকারীদের উপর।

DGTR-এর সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত

এই ঘটনার মোড় আসে ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ DGTR ‘ফাইনাল ফাইন্ডিংস’ (ফাইল নং 6/34/2024-DGTR) প্রকাশের পর। কয়েক মাস তদন্তের পর, তারা সুপারিশ জারি করে, যা MEG ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

DGTR প্রস্তাব করেছিল নিম্নলিখিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD):

কুয়েত: $103 প্রতি MT (~₹9.00/কেজি)

সাবিক (সৌদি আরব): $113 প্রতি MT (~₹10.0/কেজি)

সিঙ্গাপুর: $137 প্রতি MT (~₹12.0/কেজি)

DGTR এই ধরনের তদন্তে সাধারণভাবে দেশের শিল্পে 'প্রকৃত ক্ষতি' দেখে। এর মধ্যে থাকে দাম কমানো, দেশীয় দাম নিয়ন্ত্রণে বাধা দেওয়া, এবং বাজারের হারানোর প্রভাব বিশ্লেষণ করার মতো বিষয়গুলি।

ডিরেক্টরেটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে দেশীয় MEG উৎপাদকদের তদন্তে অংশগ্রহণের স্তরও বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, IGL 'ট্রেড নোটিশ'-এর প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সব তথ্য জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, IOC আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে তদন্তে সাহায্য করলেও, দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি তেল পরিশোধন ও বিপণন কোম্পানি ক্ষতির মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তারিত আর্থিক ও খরচের তথ্য দেয়নি। ফলস্বরূপ, তদন্তে IOC কে কেবল সমর্থক হিসেবে ধরা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী দেশীয় উৎপাদক হিসেবে নয়।

শিল্প বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারী সংস্থাগুলি মনে করেন, DGTR-এর বিশ্লেষণ ভারতের MEG বাজারের জন্য মূলত ভুল। প্রথমত, ডিরেক্টরেট 'ক্ষমতার সীমা' যুক্তিটি মানেনি। দেশীয় MEG উৎপাদকরা বাজার হারাতে পারে না যদি তাদের যথেষ্ট উৎপাদন ক্ষমতা না থাকে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ৪০% ব্যবধান থাকায় আমদানি বাধ্যতামূলক, প্রতিযোগিতা নয়। দ্বিতীয়ত, 'লাভের' যুক্তি দুর্বল। RIL ও অন্যান্য দেশীয় পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদকরা পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন ও পরিশোধনে ভালো লাভ দেখিয়েছে। 'আর্থিক ক্ষতি' দাবিটা RIL, IOC ও IGL-এর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলানো কঠিন, কারণ তারা কোনো পণ্য বা বিভাগের আলাদা লাভ দেখায় না।

যদিও RIL ভারতের সবচেয়ে বড় বেসরকারি কোম্পানিটি বাস্তবে এক সমন্বিত কোম্পানি হিসেবে কাজ করে এবং এক ছাতার নিচে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে। মূল কোম্পানির মোট লাভ জানা গেলেও, প্রতিটি পণ্য থেকে কত লাভ হচ্ছে তা জানা যায় না। তবে সরকার চাইলে এই তথ্য পেতে পারে।

তৃতীয়ত, DGTR সম্ভবত 'ক্যাপটিভ ব্যবহার'(কোম্পানি তার উৎপাদিত পণ্য নিজের কাজে ব্যবহার করা, বাজারে বিক্রি না করে) বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। যেমন বলা হয়েছে, RIL তার MEG-এর ৬০% নিজের পলিয়েস্টার তৈরিতে ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, RIL-এর 'ক্ষতি' শুধুমাত্র বাজারে বিক্রি হওয়া MEG-এর উপর হিসাব করা হচ্ছে, পুরো কোম্পানির অবস্থা দেখা হচ্ছে না। এর ফলে MEG ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি ভুলভাবে বোঝানো হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়কে ঘিরে যে সমস্যা

DGTR-এর সুপারিশটি চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তির জন্য‌ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। এটিই শেষ বাধা হতে পারে। অতীতে দেখা গিয়েছে, DGTR-এর সুপারিশ মেনে নেবে কিনা তা নিজের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন ২০২০ সালে PTA আমদানি উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে। 

বর্তমানে PTAIA, NITMA, CITI এবং অন্যান্য সংগঠনগুলি DGTR-এর সিদ্ধান্ত বাতিল করানোর জন্য যে লবিং চালাচ্ছে তার মূল লক্ষ্ হলো অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামানের উপর প্রভাব ফেলা। এই সংগঠনগুলি অর্থ মন্ত্রণালয়কে DGTR-এর সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে এবং এই সিদ্ধান্তকে শুধুমাত্র ব্যবসার সুবিধা হিসেবে নয়, কোটি কোটি শ্রমিকের কাজ রক্ষা করার বিষয় হিসেবেও তুলে আনছে।

জিএসটির সমস্যা

সরকারের নীতিই যেন বিভক্ত— এক অংশ অন্য অংশের কাজ সম্পর্কে জানে না।

বস্ত্র মন্ত্রণালয়: এই মন্ত্রণালয় যারা বস্ত্রশিল্পকে উন্নত করতে কাজ করে, তারা সম্প্রতি MMF, সুতো ও ফিলামেন্টের উপর জিএসটি ৫ শতাংশে কমানো নিয়ে উদযাপন করছে। এই পদক্ষেপকে বস্ত্র পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর এবং সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা করার বড় উদ্যোগ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য বিভাগ (DGTR): এই বিভাগের ডিরেক্টরেট এমন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছে, যা কাঁচামালের খরচ আরও প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।

উল্লেখিত সংগঠনগুলি বলছে, প্রস্তাবিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) জিএসটির হ্রাসের সুবিধা নষ্ট করে দেবে। গ্রাহকরা দাম কমার বিষয়টি দেখবে না, কারণ কর সাশ্রয় কাঁচামালের বেশি মূল্যের দ্বারা পূরণ করা হবে। নিচের স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে MSME-র মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য, লাভের হার বাড়ানো কঠিন হয়ে যাবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কমেও যেতে পারে। সুবিধাভোগী হবে RIL, IOC ও IGL-পেট্রোকেমিক্যালের উর্ধ্বমুখী উৎপাদকরা। আসলে সেই লাভ তারা পাবে, যা আসলে গ্রাহকরা পাওয়ার কথা ছিল।

পিএলআই (PLI) দ্বন্দ্ব

সরকার একটি বড় PLI (Production Linked Incentive) পরিকল্পনা চালু করেছে, যাতে বস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো, ২০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আনা এবং তিন লক্ষ নতুন চাকরি তৈরি করা যায়। উদ্দেশ্য হলো ভারতকে চিন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম একটি বৈশ্বিক বস্ত্র কেন্দ্র বানানো।

তবে তুন কারখানা তৈরি হওয়ার আগেই, বস্ত্রশিল্পের মূল কাঁচামাল MEG-এর দাম ২০% বাড়িয়ে সরকার নিচের স্তরের শিল্পকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিচ্ছে। যারা PLI পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করেছিল, তারা এখন প্রতারিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছে। NITMA স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে, এই পরিকল্পিত বিনিয়োগগুলি 'পথভ্রষ্ট' হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদি ভিয়েতনামে কাঁচামালের দাম কম হয়, তাহলে কেন একজন বিনিয়োগকারী ভারতে গার্মেন্টস রফতানি করার জন্য কারখানা তৈরি করবে?

রফতানি লক্ষ্য আসলে একটি মিথ

বস্ত্র মন্ত্রণালয় ২০৩০ সালের মধ্যে বস্ত্র বাণিজ্যের জন্য ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য ঠিক করেছে, এর মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারই আসবে রফতানি থেকে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তুলা (যার উৎপাদন বৃদ্ধি স্থির) থেকে MMF (পলিয়েস্টার) এ বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার, যা এখন বিশ্বের ফাইবার ব্যবহারিকের ৭২ শতাংশ দখল করে রেখেছে।

একদিকে যেমন ভারতের পলিয়েস্টার চেইন এই শুল্কের কারণে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে চিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিযোগীরা আন্তর্জাতিক দামে ($540/MT) MEG পাচ্ছে। যদি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হলে ভারতের বস্ত্র ও গার্মেন্টস রফতানিকারকদের আন্তর্জাতিক দাম, শুল্ক এবং আমদানি প্রিমিয়ামে ($670/MT) দিতে হবে। অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক গার্মেন্টস বাজারে লাভের হিসাব সেন্টে করা হয়। এই পার্থক্যের কারণে ভারতীয় পণ্যগুলি মার্কিন ও ইউরোপের দোকানে বিক্রি হবে না। সূত্র বলছে, এতে ২০৩০ সালের রফতানি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

MSME-গুলিতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বস্ত্রশিল্প ইতোমধ্যেই একটি আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন, যা 'উল্টানো শুল্ক কাঠামো' (inverted duty structure) নামে পরিচিত।

ইনপুট কর: MEG-এর উপর জিএসটি ১৮ শতাংশ।

আউটপুট কর: ফাইবার/ সুতোর উপর জিএসটি ৫ শতাংশ।

এর মানে, উৎপাদকরা তাদের ইনপুটের উপর যা কর দেন, তা আউটপুটের উপর যা কর আদায় হয় তার চেয়ে বেশি হয়। ফলে ক্রমাগত কর শুল্ক জমা হয় এবং মূল কাজের মূলধন আটকে যায়। একটি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) এটি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) এমন খরচ যা ফেরত পাওয়ার উপায় নেই; এটি সরাসরি লাভের উপর প্রভাব ফেলে। সীমিত তহবিলের MSME-গুলির জন্য, এই অতিরিক্ত বোঝা প্রায়শই তাদের ব্যাবসা শেষ করে দেয়, এক অভ্যন্তরীণ সূত্র, পরিচয় না জানানোর শর্তে জানিয়েছেন, অনেকেই সরকার বা MEG উৎপাদনকারী বড় কোম্পানির বিরোধিতা করতে চাননি। কেবল সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা আমাদেরকে তাদের সরকারের কাছে লেখা চিঠিগুলি দেখিয়েছেন।

ভারতের বস্ত্রশিল্প কৃষির পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান জোগায়। একটি অনুমান অনুযায়ী, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) আরোপ করলে শুধু কোটি কোটি শ্রমিকের জীবিকা বিপন্ন হবে না, PLI পরিকল্পনার আওতায় ৩ লক্ষ নতুন চাকরিও ঝুঁকিতে পড়বে। MSME-গুলির কাছে MEG উৎপাদনকারী বড় কোম্পানির মতো আর্থিক সুরক্ষা নেই। RIL-এর মতো বড় কোম্পানি তাদের পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের ক্ষতি তেলের পরিশোধন বা খুচরা ব্যবসার লাভ দিয়ে পূরণ করতে পারে। কিন্তু কোয়েম্বাটুরের মতো একটি স্বাধীন সুতো কারখানার এমন কোনো সুরক্ষা নেই। MEG-এর দাম বাড়লে সুতো তৈরি বন্ধ হয় এবং শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হয়।

NITMA সভাপতি সিদ্ধার্থ খন্না উল্লেখ করেছেন, 

অনেক কারখানার মালিক তাঁদের কারখানার ছেড়ে দিতে প্রস্তুত

কারণ এত বেশি খরচে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। উদ্বেগের কারণ শুধুমাত্র লাভের অংশ কমতে থাকা নয়, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াও।

প্রভাব

MEG-এর প্রতি কেজি ১২ টাকার দাম বৃদ্ধির প্রভাব পুরো উৎপাদন চেইনে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল্যস্ফীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। (গ্রাফিক ৫ দেখুন)।

বন্দরগুলিতে প্রতি কেজি ১২ টাকার খরচ বৃদ্ধিতে খুচরা দামে প্রায় ৮ টাকার বৃদ্ধি হয়।‌ এতে বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং ভোক্তারা সস্তা বিকল্প বা আমদানির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

২০১৪-২০২৫ 

২০১৪-২০১৯: PTA-এর উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) আরোপ করা হয়। এতে RIL লাভবান হয়, কিন্তু ছোট ব্যাবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফেব্রুয়ারি ২০২০: কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘জনস্বার্থে’ PTA-এর উপর থেকে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) তুলে নেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন স্বীকার করেছিলেন, প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২০-২০২৪: PTA-এর দামে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসলেও, MEG নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়, কারণ RIL, IOC ও IGL নতুন ধরনের সুরক্ষা চাইতে থাকে।

২০২৪-২০২৫: ২০২৪-২০২৫ সালে MEG-এর উপর আবার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) তদন্ত শুরু হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে DGTR শুল্ক আরোপের সুপারিশ করে। ফলে আগের মতো একই প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়।

একটি কাঁচামাল (PTA) থেকে সুরক্ষা তুলে নেওয়া হলে নজর ঘুরে যায় অন্য কাঁচামালের (MEG) দিকে। উদ্দেশ্য একই থাকে, বড় কোম্পানিগুলিকে সুবিধে করে দেওয়া।

ঝুঁকির মুখে বিনিয়োগ 

PTAIA বিভিন্ন সরকারি দফতরে যে তথ্য দিয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের উপর কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে (গ্রাফিক ৬ দেখুন)।

ঘাটতির বাস্তব রূপ

দেশীয় MEG উৎপাদন চাহিদা পূরণ করতে পারে না— এটিই অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) আরোপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা (মিলিয়ন মেট্রিক টন):

RIL: প্রায় ১.৭

IOC: প্রায় ০.৭

IGL: প্রায় ০.১

মোট উৎপাদনের ক্ষমতা: প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন

মোট চাহিদা: প্রায় ৩.১ মিলিয়ন মেট্রিক টন

শিল্প সংগঠনগুলির হিসাব বলছে, দেশের সব কারখানা যদি সারাবছর পূর্ণ সক্ষমতায়ও চলে, তবুও প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যেই দেশে MEG-এর মজুত ফুরিয়ে যাবে।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি

যেসব দেশে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) আরোপের কথা বলা হচ্ছে— সৌদি আরব (Sabic), কুয়েত ও সিঙ্গাপুর এই দেশগুলি কোনো সাধারণ বাণিজ্য অংশীদার নয়; ভারতের জন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। সৌদি আরব ও কুয়েত ভারতের বড় তেল সরবরাহকারী দেশ। ভারত তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আনে। তাই এই দেশগুলি ভারতের জ্বালানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সিঙ্গাপুর একটি বড় আর্থিক কেন্দ্র, যা ভারতের 'লুক ইস্ট' নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশে ঘাটতি থাকা এমন একটি পণ্যের ক্ষেত্রে, এই দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে জড়ানো কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জানা গিয়েছে, DGTR–এর তদন্তের শুরুতে সৌদি আরবকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও পরে আবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একটি সূত্রের মতে, কখনও অন্তর্ভুক্ত করা, কখনও বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, তদন্তটি অর্থনৈতিক নীতি বা কূটনৈতিক কৌশলের চেয়ে কর্পোরেট লবিংয়ের প্রভাবেই বেশি হয়েছে।                                             

চিন ফ্যাক্টর

বিশ্বের মোট পলিয়েস্টার উৎপাদনের ৫৫ শতাংশের বেশি চিনের হাতে। দাম কম থাকলে চীনা শিল্পকারখানাগুলি MEG বেশি করে কিনে মজুত করে, আর সরকারি ভর্তুকির সুবিধাও পায়। অন্যদিকে, ভারতে MEG-এর দাম কৃত্রিমভাবে বেশি থাকায় বিশ্ববাজারে টেক্সটাইল ও পোশাক রফতানিতে চিন বাড়তি সুবিধা পায়।

যদি অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) চালু হয়, তাহলে ভারতীয় পোশাক প্রস্তুতকারকদের কাছে দেশে দামী MEG দিয়ে কাপড় বানানোর চেয়ে চিন থেকে তৈরি কাপড় আমদানি করা সস্তা পড়বে। ফলে যে নীতি দেশীয় পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পকে রক্ষা করার কথা, সেটাই শেষ পর্যন্ত দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এমনকি ধ্বংসের মুখেও ঠেলে দিতে পারে। পাশাপাশি চিনের রফতানি বাড়িয়ে দেবে। সূত্রের মতে, আসলে এই নীতির উল্টো ফল হচ্ছে— রক্ষা করার কথা বলা হলেও, আদতে ক্ষতিই হচ্ছে।

৩. ঐক্যবদ্ধ তাঁতিদের শেষ লড়াই

ভারতের বস্ত্রশিল্প সাধারণত বিভিন্নভাগে কাজ করে। কিন্তু এবার বড় সংকটের কারণে তারা সবাই একসঙ্গে হয়েছে। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD)-এর বিরুদ্ধে লড়তে আগে যারা কখনই একসঙ্গে হয়নি, এখন তারাও একজোট হয়েছে। এই জোটে রয়েছে: CITI, সাউদার্ন ইন্ডিয়া মিলস অ্যাসোসিয়েশন (SIMA), পিএইচডি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, PTAIA, NITMA, টেক্সটাইল অ্যাসোসিয়েশন (ইন্ডিয়া) (TAI), সাউদার্ন গুজরাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (SGCCI)-র মধ্যে।

এছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রক, দফতর ও সরকারি সংস্থায় পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে আরও বেশ কিছু সংগঠন, যেমন: শিফলি এমব্রয়ডারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (SEMA), পানিপথ ডায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (PDA), অমৃতসর ডায়ার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ADIYA), ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান আর্ট সিল্ক উইভিং ইন্ডাস্ট্রি (FIASWI), পানিপথ ইয়ার্ন ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন, হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স ক্লাব (HMEC), ইয়াং এন্টারপ্রেনার্স সোসাইটি (YES), ডেনিম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (DMA)।

১৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা একজোট হয়ে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রাজস্ব সচিব অরবিন্দ শ্রীবাস্তব, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যালস সচিব নিবেদিতা শুক্লা বর্মা এবং বস্ত্র মন্ত্রকের যুগ্মসচিবও পদ্মিনী শিংলা-সহ আরও অনেকে।

ডিসেম্বর ৪ তারিখ সন্ধেতে এই প্রতিবেদনের লেখকেরা RIL, IOC, IGL, DGTR এবং বাণিজ্য ও শিল্প, বস্ত্র, রাসায়নিক ও সার মন্ত্রক-সহ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং এবং রাসায়নিক ও সারমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডার কাছে প্রশ্নপত্র ইমেল করেন। তাঁদের কাছ থেকে উত্তর পেলেই এই প্রতিবেদনটিতে তা জুড়ে দেওয়া হবে।

(গ্রাফিক্স ৫)

শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীনে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে মনো ইথাইলিন গ্লাইকোল (MEG) আমদানির উপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক (ADD) বসানোর সুপারিশ করে। নিয়ম অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রকের তিন মাসের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা ছিল। সেই সময়সীমা শেষ হয় ২৩ ডিসেম্বর।

কিন্তু শিল্প সংস্থা কেমিক্যালস অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (CPMA) অর্থ মন্ত্রককে ওই শুল্ক আরোপে রাজি করাতে পারেনি। এই সংস্থার সদস্যদের মধ্যে রয়েছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রোলিয়াম, গেইল (ইন্ডিয়া), হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, আদানি পেট্রোকেমিক্যালস, ফিনোলেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, নয়ারা এনার্জি, ডিসিএম শ্রীরাম, গুজরাট স্টেট ফার্টিলাইজার্স কর্পোরেশন-সহ আরও বেশ কয়েকটি বড় সংস্থা।

সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ ছিল। পীযূষ গোয়েলের নেতৃত্বাধীন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রক সিপিএমএর অবস্থানকে সমর্থন করেছিল বলে জানা যায়। অন্যদিকে, গিরিরাজ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বস্ত্র মন্ত্রক MEG ব্যবহারকারী শিল্প সংগঠনগুলির পক্ষ নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারী শিল্পগুলির মতই প্রাধান্য পায় এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট প্রস্তাবে (১ ফেব্রুয়ারি উপস্থাপিত) অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শুল্ক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন করেননি।

এই সিদ্ধান্তকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী সংস্থার জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব সংস্থায় গ্রামীণ এলাকার বহু নারী-সহ কোটি কোটি মানুষ কাজ করেন।

লেখক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা এবং আয়ুষ যোশী স্বাধীন সাংবাদিক

(মূল প্রতিবেদনটি প্রাথমিকভাবে নিউ দিল্লি পোস্ট-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)

 

Featured Book: As Author
Gas Wars
Crony Capitalism and the Ambanis
Also available:
 
Featured Book: As Publisher
Disappearing Democracy
Dismantling Of A Nation
  • Authorship: By Avay Shukla
  • Publisher: Paranjoy Guha Thakurta
  • 242 pages
  • Published month:
  • Buy from Amazon